প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কখনই সশস্ত্র বাহিনীকে ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেনি, বরং বরাবরই চেয়েছে একে একটি শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল এবং মর্যাদাপূর্ণ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত সশস্ত্র বাহিনী আমাদের জাতির অহংকার। এই সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
২১ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেত্রীবৃন্দ, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে কাজ করেছে। কারণ আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সশস্ত্র বাহিনীকে কখনও আমাদের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করিনি। ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বারবার ক্যু করে সশস্ত্র বাহিনীর শত শত অফিসার-সৈনিকদের হত্যা করিনি। আমরা চেয়েছি শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপন করে একে একটি সুন্দর সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে এবং এই সশস্ত্র বাহিনী যেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হয়। শুধু বাংলাদেশের জনগণের নয়, সারা বিশ্বব্যাপী আস্থা-বিশ্বাস যেন অর্জন করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।’
সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে আজকের এই দিনটি এক বিশেষ গৌরবময় স্থান দখল করে আছে। যুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে ১৯৭১ সালের এই দিনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যরা যৌথভাবে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের সূচনা করে। সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর সাথে সম্মিলিত বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ আক্রমণে পর্যুদস্ত দখলদার বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। যার ফলশ্রুতিতে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মহান আত্মত্যাগ ও বীরত্ব গাঁথা জাতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত সশস্ত্র বাহিনী আমাদের জাতির অহংকার। আমি তাদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি। আপনারা শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতায় সর্বত্র প্রশংসিত হতে পারেন। দেশের প্রতিরক্ষা ও দেশ গড়ার কাজে অবদান রেখে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্য নিজেদের গৌরব সমুন্নত রাখতে পারবেন-এই বিশ্বাস আমার আছে।
সশস্ত্র বাহিনী দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চারনেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ’৭০ এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা তখন ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং আন্দোলন, সংগ্রাম চালিয়ে যান। এরই এক পর্যায়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ কাল রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং গণহত্যা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা স্বাধীনতা ঘোষণা দেন এবং শেষ শত্রুটি বাংলার মাটি থেকে বিদায় না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য বলেন।’
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন সম্পর্কে বলেন, ১০ এপ্রিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। তিনি বলেন, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই জাতির পিতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু, তাঁরই সহযোগিরা তাঁরই নির্দেশ এবং ব্যবস্থা অনুসারে এই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। যে সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। কঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিলে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার শপথ গ্রহণ করে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলার মানুষ- কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, জনতা এবং আমাদের বিভিন্ন বাহিনীর যারা বাঙালি সদস্যরা ছিলেন প্রত্যেকেই মুক্তিযদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এরই এক পর্যায়ে একাত্তরের ২১ নভেম্বর আমাদের এই সশস্ত্রবাহিনী প্রতিষ্ঠা করে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ শত্রু মুক্ত হয়।
১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু জাতি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকেও সর্বাধুনিক একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য অন্ন সংস্থান, এককোটি শরণার্থী এবং ৩ কোটি গৃহহীন এবং সম্ভ্রমহারা মা-বোনদেরকে পুনর্বাসনের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লক্ষ্য ছিল একটি দক্ষ ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা।’
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কাঠামোর উন্নতিকল্পে বঙ্গবন্ধু মিলিটারি একাডেমী, কম্বাইন্ড আর্মড স্কুল ও প্রতিটি কোরের জন্য ট্রেনিং স্কুলসহ আরও অনেক সামরিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুই নৌবাহিনীকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে একইসাথে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তিনটি ঘাঁটি উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভারত ও যুগোশ্লাভিয়া থেকে নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধ জাহাজ সংগ্রহ করা হয়। একইভাবে বিমান বাহিনীর উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তে ১৯৭৩ সালেই সে সময়ের অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিগ-২১ যুদ্ধবিমানসহ হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান এবং এয়ার ডিফেন্স র্যাডার ইত্যাদি সংযোজনের মাধ্যমে এদেশে একটি আধুনিক বিমান বাহিনীর প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়।
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র বাহিনীর যে সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করে গেছেন তারই উপর দাঁড়িয়ে আজ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং কর্মদক্ষতার পরিচিতি দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লে স্বীকৃত ও প্রশংসিত।’
সশস্ত্র বাহিনী আজ তাদের নানাবিধ জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের নির্ভরতা অর্জন করছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলাসহ উদ্ধার তৎপরতা ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনকল্পে সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী জাতিগঠনে বর্তমান সময়ে সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বিশ্ব দরবারে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। সশস্ত্র বাহিনীকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করে তোলার জন্য তার সরকার কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান শেখ হাসিনা।
আজকের বাজার:এলকে/এলকে ২১ নভেম্বর ২০১৭